মেনু নির্বাচন করুন
পাতা

মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা

বাঙালিজাতির হাজার বছরের ইতিহাস অধিকার আদায়ের সংগ্রাম মুখর। দেশেরদক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জনপদ চুয়াডাঙ্গা জেলার মানুষের ও রয়েছেএই মুক্তির লড়াইয়ে শামিল হবার গৌরবময় ইতিহাস। বৃটিশ শাসনের সূচনা কাল হতেইভারতবর্ষের অন্যান্য জায়গার মতোই তৎকালীন নদীয়া জেলার অন্তর্ভূক্তচুয়াডাঙ্গার মানুষও অগণিত বিদ্রোহ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছে।

তিতুমীরপরিচালিত ওহাবী আন্দোলন থেকে শুরু করে ফরায়েজী আন্দোলন, নীল বিদ্রোহ, স্বদেশী ও খেলাফত আন্দোলন। পরবর্তীতে অসহযোগ ও আইন অমান্য আন্দোলন চূড়ান্তরুপে ব্রিটিশদের উপমহাদেশ ছাড়তে বাধ্য করে। সৃষ্টি হয় ভারত ও পাকিস্তাননামক দুটি নতুন রাষ্ট্রের। সবটাতেই ছিল চুয়াডাঙ্গা বাসীর স্বতস্ফূর্তঅংশগ্রহণ। এর পর শুরু মায়ের ভাষা বাংলার অধিকার ভাষা আন্দোলন নিয়ে। ২১ফেব্রুয়ারীর ১৪৪ ধারা ভঙ্গকারী মিছিলের তৈয়বুর, মহিউদ্দি প্রমুখ এইচুয়াডাঙ্গারই সন্তান।এই ভাষা আন্দোলনকে উপলক্ষ করেই চুয়াডাঙ্গা বালিকাবিদ্যালয়ের ছাত্রীরা প্রথমবারের মতো রাজপথে নেমে আসে,অংশগ্রহণ করেবিক্ষোভমিছিল ও ধর্মঘটে। একে একে আসে ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন,

 

১৯৬৬ সালে আঞ্চলিক স্বায়ত্ত্বশাসন ও অর্থনৈতিক সাম্যের ভিত্তিতে রচিত আওমী লীগের ৬ দফার আন্দোলন এবং উনসত্তুরের গণঅভ্যুথ্থান।

১৯৭০সালে পাকিস্তানের জাতীয় ও প্রদেশিক পরিষদের নির্বাচনে সারাদেশের মতোইচুয়াডাঙ্গাবাসী জাতীয় ও প্রদেশিক পরিষদে আওমী লীগ মনোনীত ব্যারিস্টার বাদলরশীদ (জাতীয় পরিষদ), ডাঃ আসহাব-উল হক (প্রাদেশিক পরিষদ, চুয়াডাঙ্গা-১) ওঅ্যাডভোকেট ইউনুস আলী (প্রাদেশিক পরিষদ, চুয়াডাঙ্গা-২) -দেরকে বিপুল ভোটেনির্বচিত করেন। ৭১ সালের ১ মার্চ ইয়াহিয়া হঠাৎ করেই নবগঠিত জাতীয় পরিষদেরআহুত অধিবেশন অনির্দিষ্ট কালের জন্য স্থগিত ঘোষনা করেলে চুয়াডাঙ্গাতেওবিক্ষোভ মিছিল ও হরতার পালিত হয়। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষন শোনার পর হতেইচুয়াডাঙ্গায় শুরু হয় প্রতিরোধের প্রস্ত্ততি ।

২৫মার্চ দিবাগত রাতে পাকিস্তানি বাহিনী অপারেশন সার্চ লাইট পরিকল্পনাঅনুয়ায়ী বাঙালি হত্যায় মেতে ওঠে। চুয়াডাঙ্গা মহকুমা আওয়ামী লীগের সভাপতিডাঃ আসহাব-উল হকের বাড়িতে একাধিক টেলিফোনে ঢাকা পতনের খবর আসে। গ্রেফতারএড়াতে তিনি বাড়ি থেকে বেড় হয়ে যান। চুয়াডাঙ্গা মহকুমা আওয়ামী লীগেরসাধারণসম্পাদক অ্যাডভোকেট ইউনুস আলী রাত সোয়া একটায় ই.পি.আর-এর অয়ারলেসেধরা বঙ্গবন্ধুর একটি বার্তা পান, যেখানে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশকে একটি স্বাধীনদেশ হিসেবে ঘোষণা করেন এবং দেশ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত সবাইকে পাকিস্তানিবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাবার আহবান জানান।

 

 

২৬মার্চ সকালে ঢাকার গণহত্যার খবর চুয়াডাঙ্গায় ছড়িয়ে পড়লে সবার মধ্যে আতন্কছড়িয়ে পড়ে। এদিকে আগের রাতেই যশোর সেনানিবাস হতে একদল সৈন্য কুষ্টিয়া শহরদখল করে নেয়ায় চুয়াডাঙ্গাবাসী তাদের শহরকে রক্ষার জন্য শহরের প্রবেশপথগুলোতে গাছের ডাল কেটে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। সেই সাথে মহকুমারবিভিন্ন এলাকা থেকে আনসার, মুজাহিদ ও স্বেচ্ছা সেবকদের শ্রীমন্ত টাউনহলেএকত্রিত করে চুয়াডাঙ্গা ট্রেজারি থেকে সকল অস্ত্র ও গোলাবারুদ তাদের মধ্যেবিলিয়ে দিয়ে প্রতিরোধ ব্যবস্থা মজবুত করা হয়।

১৯৭১সালে ই.পি.আর ৪ নং উইং-এর সদর দপ্তর চুয়াডাঙ্গায় ছিল এবং সৌভাগ্য বসত সেইসময়ে উইং অধিনায়ক মেজর আবু ওসমান চৌধুরী সহ কয়েক জন বাঙালি অফিসার সেখানেকর্মরত ছিলেন। ইতোমধ্যে ৬ মার্চেই অ্যাডভোকেট ইউনুস আলীর সাথে মেজর আবুওসমান চৌধুরীর গোপন বৈঠক হয় এবং তিনি ভবিষ্যতে সব ধরনের সহযোগীতার আশ্বাসদেন। ২৫ মার্চ রাতে অফিসের কাজে তিনি কুষ্টিয়ায় অবস্থান করায় ২৬ মার্চপাকিস্থানি বাহিনীর নজর এড়িয়ে চুয়াডাঙ্গায় ফিরে আসেন। এদিকে ঢাকার পিলখানা ওরাজারবাগের মর্মান্তিক ঘটনা জানার পর ২৬ মার্চেই উইং হাবিলদার মেজর মজিবরচুয়াডাঙ্গা ই.পি.আর সদর দপ্তরের সকল অবাঙালি সৈনিকদের বন্দি করে অস্ত্রাগারথেকে সব অস্ত্র-গোলাবারুদ সরিয়ে রাখেন।

 

সেইদিন বিকেলেই স্থানীয় এক জরুরী সভায় মেজর আবু ওসমান চৌধুরীকে অধিনায়ক, ডাঃআসহাব-উল হককে প্রধান উপদেষ্টা এবং ব্যারিস্টার বাদল রশীদ ও অ্যাডভোকেটইউনুস আলীকে উপদেষ্টা করে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর দক্ষিণ-পশ্চিম কমান্ডগঠন করা হয়। ২৭ তারিখ সকালে ই.পি.আর হেড কোয়ার্টারে মেজর আবু ওসমান চৌধুরীরনেতৃত্বে পাকিসআনি পতাকা নামিয়ে সম্পূর্ণ সামরিক কায়দায় বাংলাদেশের পতাকাউত্তোলন করা হয়। আবু ওসমান চৌধুরী তার এক লেখায় লিখেছেন,”আমাদেরবর্তমান করণীয় ও ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা শেষে বাইরে অপেক্ষমানউত্তাল জনসমুদ্রের হুন্কার আমাকে বুঝিয়ে দিল আমার মূলধন শুধু ই.পি.আরবাহিনী ও তাদের ৩০৩ রাইফেলই নয়, আমার চূড়ান্ত হাতিয়ার বাংলার স্বাধীনতাকামীআপামর জনসাধারণ, যা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নেই”

চুয়াডাঙ্গায়প্রথম সংঘর্ষ শুরু হয় ২৭ মার্চ। সেদিন চুয়াডাঙ্গা ই.পি.আর ৪র্থ উইং-এরপলায়ন রত অবাঙালি ক্যাপ্টেন সাদেক হোসেন বাঙালি ই.পি.আর সৈন্যদের নিরস্ত্রকরার উদ্দেশ্যে সরাসরি সীমান্তবর্তী যাদবপুর ফাঁড়িতে গিয়ে কর্তব্যরতপ্রহরীদের সাথে বচসায় লিপ্ত হলে এক পর্যায়ে সেই ক্যাপ্টেন প্রহরী সিপাহীকেমেরে ফেলায় প্রতিশোধপরায়ন বাঙালি সৈন্যরা সেই ক্যাপ্টেনকে সদলবলে হত্যাকরে। এদিকে দক্ষিণ-পশ্চিম রণাঙ্গনের সদরদপ্তর চুয়াডাঙ্গাকে ঘিরে বিভিন্নফ্রন্টে যুদ্ধ চললেও যুদ্ধাহতদের সেবায় কোন চিকিৎসা সেবার ব্যাবস্থা ছিলনা।এমতাবস্থায় কয়েকজন নিবেদিত প্রাণ ডাক্তারের ঐকান্তিক প্রচেষ্ঠায় ও ভারতীয়রেডক্রসের কাছ হতে পাওয়া সহযোগীতায় চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের সদ্য নির্মিতভবনে হাসপাতাল চালু করা হয়। সেই যুদ্ধে আহতদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য ডাঃআসহাব- উল হককে চেয়ারম্যান ও ডাঃ শামসুজ্জোহা কোরেশীকে মহাসচিব করেচুয়াডাঙ্গায় সর্বপ্রথম বাংলাদেশ রেডক্রস (বর্তমান রেডক্রিসেন্ট) গঠন করাহয়।

 

ক্রমান্বয়েবর্হিবিশ্বের সাথে দক্ষিণ-পশ্চিম রণাঙ্গনের কহটনৈতিক ও টেলিযোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতার জন্য কহটনৈতিকযোগাযোগ ও প্রচারণার উদ্দেশে উপদেষ্টা ব্যরিস্টার বাদল রশীদকে ২৭ মার্চেভারতে পাঠানো হয়। সেই সাথে ২৮ মার্চের মধ্যেই দর্শনা-ভারত ট্রেন লাইনেররেল-টেলিফোনকে দ্রুত সংস্কার করে বর্হিবিশ্বের সাথে তারযোগাযোগ ব্যবস্থাগড়ে তোলা হয় এবং সেই লাইনেই প্রথমে ডাঃ অসহাব-উল হক পশ্চিমবঙ্গেওমূখ্যমন্ত্রী অজয় কুমার মুখোপাধ্যয়ের সাথে কথা বলে সাহায্যের আবেদন জানান।

 

এদিকেচুয়াডাঙ্গায় যখন অত্যন্ত শক্তিশালী প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, তখনপাশের জেলা কুষ্টিয়াপাকিস্তানি বাহিনীর হাতে পুরোপুরি অবরুদ্ধ। কিন্তুপার্শ্ববর্তী জেলাকে এভাবে শত্রুর দখলে রেখে চুয়াডাঙ্গা থেকে মুক্তিযুদ্ধেরনেতৃত্ব দেয়া সম্ভব নয়। তাইতো চুয়াডাঙ্গায় বসে ডাঃ আসহাব-উল হক ও মেজর আবুওসমান চৌধুরী কুষ্টিয়া শহরকে শত্রুমুক্ত করার জন্য স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীদ্বারা চারদিক থেকে আক্রমনের পরিকল্পনা করেন। এই প্রস্ত্ততিতে মেহেরপুরেরতৎকালীন মহকুমা প্রশাসক তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী মেহেরপুর এলাকার সকল বাহিনীকেএকত্রিত করে সহযোগীতার হাত বাড়িয়ে দেন। সব প্রস্ত্ততি শেষ হলে ৩০ আর্চ ভোরথেকে ’’ অপারেশন ফার্স্ট লেগ’’ নামের কুষ্টিয়া শহর শত্রুমুক্ত করার আক্রমণশুরু হয়। দিনভর যুদ্ধ শেষে অনেক হতাহতের পর পাকিস্তানি বাহিনী সন্ধার পরপিছু হটে কুষ্টিয়া ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। এই আক্রমণে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীরসহযোগীতায় কয়েক হাজার সাধারণ জনগণ এগিয়ে এসেছিল।

 

 

 

চুয়াডাঙ্গাশত্রুমুক্ত থাকার খবর শুনে আওয়ামী লীগের তৎকালীন কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদকও পরবর্তীতে সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দি অহমেদ ভারত গমনের উদ্দেশেএকমাত্র সঙ্গী ব্যারিস্টার অমীর-উল-ইসলামকে নিয়ে ৩০ মার্চ চুয়াডাঙ্গায়পালিয়ে আসেন। তিনি স্থানীয় নেতৃবৃন্দের সাথে আলেচনায় চুয়াডাঙ্গার সার্বিকপরিস্থিতিতে সন্তোষ প্রকাশ করে চুয়াডাঙ্গাকে যুদ্ধকালীন সময়ের জন্যবাংলাদেশের অস্থায়ী রাজধানী করার পক্ষে অভিমত ব্যক্ত করেন। সন্ধায় তিনিজীবননগর উপজেলার চ্যাংখালি সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন।

 

স্বাধীনতাযুদ্ধের শুরুতেই সীমান্তবর্তী চুয়াডাঙ্গা জেলা মুক্ত থাকার সুবাদে ওপ্রতিরোধ ব্যবস্থা শক্তিশালী হওয়ায় চুয়াডাঙ্গাই হয়ে ওঠে বাংলাদেশেররণাঙ্গনের অন্যতম সংবাদ উৎস।

 

বিদেশীসংবাদিকদের মাধ্যমে চুয়াডাঙ্গা ডেটলাইনে বাংলাদেশের বাস্তব অবস্থাবিশ্বব্যাপী প্রচারিত হওয়ায় চুয়াডাঙ্গা পাকিস্তানি বাহিনীর টার্গেটে পরিণতহয়। ৩ এপ্রিল চুয়াডাঙ্গার উপর প্রথম বিমান হামলা চালানো হয়। এদিকে ১৯৬৫সালে পাক-ভারত যুদ্ধের কারণে বন্ধ থাকা ভারত-পাকিস্তানের মধ্যকার রেলযোগাযোগ ব্যবস্থা রেলকর্মীদের অক্লান্ত পরিশ্রমে ৬ এপ্রিল চালু হয়। এদিকে৬এপ্রিল ভোর বেলা পাকিস্তানি বাহিনী যশোহর সেনানিবাস থেকে বেরিয়েবিষয়খালিতে অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাটি আক্রমণ করে। মুক্তিযোদ্ধারাপাল্টা আক্রমণ করলে পাকিস্তানি সেনারা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।এর পর থেকেক্ষিপ্রগতিতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী আকাশ ও জলপথে ব্যাপকভাবে সৈন্য ওঅস্ত্রশস্ত্র যশোর সেনানিবাসে আনতে শুরু করে। কিন্তু তখন পাকিস্তানি সেনাকেবাধা দেয়ার মতো প্রয়োজনীয় অস্ত্র ও জলযান মুক্তিযোদ্ধাদের ছিল না। আবুওসমান চৌধুরী লিখেছেন-“বিষয়খালী সঙ্ঘর্ষের পর থেকেইপাকিস্তান সেনাবাহিনী ক্ষিপ্রগতিতে ব্যাপকভাবে সৈন্য ও অস্ত্রশস্ত্র যশোরসেনানিবাসে আনতে শুরু করে। সে সময় আকাশ ও জলপথে পাকিস্তানি বাহিনীকে বাধাদেয়ার মতো প্রয়োজনীয় অস্ত্র, বিমান বা জলযান কোনটাই আমাদের ছিল না। অসহায়েরমতো দৈনন্দিন পরিস্থিতি ভারতের সমন্বয় অফিসারের কাছে টেলিফোনে জানিয়ে ভারিঅস্ত্রের জন্য তাগিদ দেওয়া ছাড়া আমাদের আর কিছুই করনীয় ছিল না।
চুয়াডাঙ্গাশত্রুমুক্ত থাকার খবর শুনে আওয়ামী লীগের তৎকালীন কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদকও পরবর্তীতে সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দি অহমেদ ভারত গমনের উদ্দেশেএকমাত্র সঙ্গী ব্যারিস্টার অমীর-উল-ইসলামকে নিয়ে ৩০ মার্চ চুয়াডাঙ্গায়পালিয়ে আসেন। তিনি স্থানীয় নেতৃবৃন্দের সাথে আলেচনায় চুয়াডাঙ্গার সার্বিকপরিস্থিতিতে সন্তোষ প্রকাশ করে চুয়াডাঙ্গাকে যুদ্ধকালীন সময়ের জন্যবাংলাদেশের অস্থায়ী রাজধানী করার পক্ষে অভিমত ব্যক্ত করেন। সন্ধায় তিনিজীবননগর উপজেলার চ্যাংখালি সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন।

 

স্বাধীনতাযুদ্ধের শুরুতেই সীমান্তবর্তী চুয়াডাঙ্গা জেলা মুক্ত থাকার সুবাদে ওপ্রতিরোধ ব্যবস্থা শক্তিশালী হওয়ায় চুয়াডাঙ্গাই হয়ে ওঠে বাংলাদেশেররণাঙ্গনের অন্যতম সংবাদ উৎস। বিদেশী সংবাদিকদের মাধ্যমে চুয়াডাঙ্গাডেটলাইনে বাংলাদেশের বাস্তব অবস্থা বিশ্বব্যাপী প্রচারিত হওয়ায় চুয়াডাঙ্গাপাকিস্তানি বাহিনীর টার্গেটে পরিণত হয়। ৩ এপ্রিল চুয়াডাঙ্গার উপর প্রথমবিমান হামলা চালানো হয়। এদিকে ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের কারণে বন্ধ থাকাভারত-পাকিস্তানের মধ্যকার রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা রেলকর্মীদের অক্লান্তপরিশ্রমে ৬ এপ্রিল চালু হয়। এদিকে ৬এপ্রিল ভোর বেলা পাকিস্তানি বাহিনীযশোহর সেনানিবাস থেকে বেরিয়ে বিষয়খালিতে অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাটিআক্রমণ করে। মুক্তিযোদ্ধারা পাল্টা আক্রমণ করলে পাকিস্তানি সেনারা ছত্রভঙ্গহয়ে যায়।এর পর থেকে ক্ষিপ্রগতিতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী আকাশ ও জলপথেব্যাপকভাবে সৈন্য ও অস্ত্রশস্ত্র যশোর সেনানিবাসে আনতে শুরু করে। কিন্তুতখন পাকিস্তানি সেনাকে বাধা দেয়ার মতো প্রয়োজনীয় অস্ত্র ও জলযানমুক্তিযোদ্ধাদের ছিল না। আবু ওসমান চৌধুরী লিখেছেন-“বিষয়খালীসঙ্ঘর্ষের পর থেকেই পাকিস্তান সেনাবাহিনী ক্ষিপ্রগতিতে ব্যাপকভাবে সৈন্য ওঅস্ত্রশস্ত্র যশোর সেনানিবাসে আনতে শুরু করে। সে সময় আকাশ ও জলপথেপাকিস্তানি বাহিনীকে বাধা দেয়ার মতো প্রয়োজনীয় অস্ত্র, বিমান বা জলযানকোনটাই আমাদের ছিল না। অসহায়ের মতো দৈনন্দিন পরিস্থিতি ভারতের সমন্বয়অফিসারের কাছে টেলিফোনে জানিয়ে ভারি অস্ত্রের জন্য তাগিদ দেওয়া ছাড়া আমাদেরআর কিছুই করনীয় ছিল না।

এদিকেদক্ষিণ-পশ্চিম রণাঙ্গনে সামরিক অফিসারের শূন্যতা পূরণের জন্য আবু ওসমানচৌধুরী ৭ এপ্রিল সেক্টর অর্ডারের মাধ্যমে যুদ্ধের ময়দানে অফিসার হিসেবে কাজকরছিলেন মেহেরপুর মহকুমা প্রশাসক তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী, ঝিনাইদহেরএস.ডি.পি,ও মাহবুবউদ্দিন আহমদ ও ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজের অধ্যাপকশফিকউল্লাহ  এই ত্রীয় অফিসারকে সরাসরি কমিশন দিয়ে র‌্যান্ক পরিয়ে দেন।

 

 

 

১০এপ্রিল আগরতলায় অনুষ্ঠিত ভারতে উপস্থিত ২৮ জন এম.পি.এ-এর উপস্থিতিতে একসভায় অস্থায়ী সরকারের রাজধানী ও শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান বাংলাদেশের মুক্তাঞ্চলচুয়াডাঙ্গায় করার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। যদিও সিদ্ধান্তটি নিরাপত্তাজনিত কারণে গোপন রাখার চেষ্টা করা হয় কিন্তুদ্রুতই তা বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে পরিবেশিত হয়। যার ফলশ্রুতিতে পাকিসাতনি বাহিনীর জঙ্গি বিমানচুয়াডাঙ্গার ওপর ব্যাপকভাবে হামলা চালাতে শুরু করে, সেই সাথে যশোরসেনানিবাস থেকে শক্তিশালী একটি দল ১৬ এপ্রিল চুয়াডাঙ্গায় প্রবেশ করেনির্বিচারে গুলি চালিয়ে অনেক লোককে হত্যা করে শহর  দখল করে নেয়। দ্রুতইদক্ষিণ-পশ্চিম রণাঙ্গনের সদর দপ্তর চুয়াডাঙ্গা থেকে অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হয়।তথ্য মন্ত্রণালয় হতে প্রকাশিত স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র পঞ্চদশ খন্ডেপ্রকাশিত সাক্ষাতকারে ব্যারিস্টার আমীর-উল-ইসলাম বলেছেনঃমন্ত্রীসভারআনুষ্ঠানিক শপথের জন্য ১৪ এপ্রিল দিনটি নির্ধারণ করা হয়েছিল। শপথের স্থানেরজন্য আমরা চুয়াডাঙ্গার কথা চিন্তা করি। কিন্তু পাক হানাদার বাহিনী সেখানেবিমান থেকে বোমা বর্ষন করে। আমরা চুয়াডাঙ্গা রাজধানী করার যে সিদ্ধান্তনিয়েছিলাম, শেষ পর্যন্ত তা আর গোপন থাকেনি। চুয়াডাঙ্গার কথা বাদ দিয়েআমাদের নতুন স্থানের কথা ভাবতে হলো”

১৭এপ্রিল। বাঙ্গালি জাতির ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক দিন। এ দিন চুয়াডাঙ্গারই.পি.আর ৪নং উইংয়ের অধীন মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলা বি.ও.পির সন্নিকটেআম্রকুঞ্জে চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুরের মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক  ওমুক্তিযুদ্ধাদের ব্যবস্থাপনায় স্বাধীন বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার শপথ গ্রহণকরেন এবং বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি ও সহযোগীতার আহবানজানান।

 

 

 

প্রাথমিকঅবস্থায় ই.পি.আর., বেঙ্গল রেজিমেন্ট, পুলিশ, আনসার, মুজাহিদ, জনতারবাংলাদেশী যোদ্ধারা বিচ্ছিন্নভাবে  প্রতিরোধ গড়ে তুললেও ক্রমে পাকিস্থানিবাহিনীর আক্রমণ তিব্র হলে পরিকল্পিত আক্রমণ ও গোলা বারুদের প্রয়োজন হয়েপড়ে। প্রয়োজন হয়ে পড়ে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনে মুক্তিযুদ্ধকে সুসংহত করারজন্য একক কমান্ড, সেই সাথে গেরিলা যুদ্ধের জন্য যুদ্ধ শিবির ও প্রশিক্ষণকেন্দ্র গোড়ে তোলা। নেতৃবৃন্দের নির্দেশে বহু যুবককে সংগঠিত করে সীমান্তেরওপারে নিয়ে ভারতীয় বাহিনীর সহযোগীতায় যুবপ্রশিক্ষণ ক্যাম্প  চালু করা হয়।  শুরু হয় পরিকল্পিত প্রতিরোধের প্রস্তুতি। মুক্তিযুদ্ধকালীন যুবনেতাসোলায়মান হক জোয়ার্দার সেলুন লিখেছেন-” নেতৃবৃন্দের নির্দেশমতো আমি চুয়াডাঙ্গার যুবক-তরুণদের একত্রিত করে ২২ এপ্রিল হৃদয়পুর শিবিরেনিয়ে গেলাম। ১২০ জন ছেলে নিয়ে আনুষ্ঠানিক ভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রথমক্যাম্প চালু হলো”।

যুদ্ধপরিচালনা সুষ্ট ও সংগঠিত করার লক্ষ্যে ১১ জুলাই বাংলাদেশের সমগ্রযুদ্ধাঞ্চলকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয়। সিনিয়র সামরিক কর্মকর্তাগণ যেযেখানে যুদ্ধরত ছিলেন, তাঁকে সে অঞ্চলের  দায়িত্ব দেওয়া হয়। ঐ এলাকার  সমস্ত  উপদলকে একক অধিনায়কত্বের আওতায় আনা হয়। চুয়াডাঙ্গা ৮নং সেক্টরেরঅর্ন্তভূক্ত হয়। চলতে থাকে পাকিস্থানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন রণাঙ্গনেসন্মুখ ও গেরিলা যুদ্ধ। ৫ আগস্ট চুয়াডাঙ্গাবাসীর জন্য একটি শোকাবহ দিন।

 
 

এদিন নাটুদহের কাছে বাগোয়ান গ্রামে পাকিস্থানি বাহিনীর সাথে সন্মুখ যুদ্ধেপিন্টু, হাসান, খোকন, কাশেম, রবিউল, রওশন, তারিক ও আফাজউদ্দিন নামে ৮জন বীরমুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। তাঁদেরকে জগন্নাথপুর গ্রামের দুটি কবরে দাফন করা হয়যা এখন আটকবর নামে পরিচিত। এছাড়াও ৭ আগস্ট জীবননগর থানার ধোপাখালিসীমান্তে নিয়মিত বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধা ও পাকিস্থানি বাহিনীর মধ্যে একরক্তক্ষয়ী যুদ্ধে পাঁচজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়।

সেপ্টেম্বরমাসে ৮নং সেক্টরের কমান্ডার হিসেবে লেঃ কর্নেল আবুল মনজুর দায়িত্ব নেন।তিনি যুদ্ধ বেগবান করা ও বিজয় অর্জনের লক্ষ্যে যুদ্ধ কৌশলে পরিবর্তন আনেন।যুদ্ধ এগিয়ে যায় চুড়ান্ত বিজয়ের দিকে। ২৬ নভেম্বর পাকিস্থানি বাহিনীকেহটিয়ে দিয়ে জীবননগর পুর্নদখলে করে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করাহয়। ৪ ডিসেম্বর মুক্ত হয় দর্শনা, ৭ ডিসেম্বর আলমডাঙ্গা ও চুয়াডাঙ্গা, সর্বোপরি ১৬ ডিসেম্বরে পাকিস্থানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মাধ্যমে সারা দেশ।বিশ্বের মানচিত্রে পথ চলতে শুরু করে বাংলাদেশ নামক দেশটি ।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 


Share with :

Facebook Twitter